মেয়েটি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। যেন সে প্রচ- আঘাতে জর্জরিত। কথা বলতে পারছে না। কথা বলতে গেলেই তার কান্না আসছে। কথা মিশে যাচ্ছে কান্নার ফোঁপানিতে।
সে আবারও জিজ্ঞেস করলোÑ কে আপনি, এতো রাতে এখানে কেন?
মেয়েটি কী বলতে গেলে আবারও কান্নার হাঁপানোতে মিইয়ে গেলো।
এবার সে একটু ধমকের সুরে বললোÑ কথা না বলে শুধু কাঁদছেন কেন? কী হয়েছে বলবেন তো।
মেয়েটি এবার কথা বলতে যেয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। কেঁদে কেঁদে বললোÑ প্লিজ আমাকে সাহায্য করুন। আমার ভীষণ বিপদ হয়েছে। সে আবারও ফুঁপাতে লাগলো।
বিপদ! সে ভ্রƒ কুঁচকালো। কী হয়েছে আপনার?
আমার অনেক বড় বিপদ হয়ে গেছে। আমাকে সাহায্য করুন, প্লীজ। মেয়েটি হাত জোড় করে আবারও কান্নার তোড়ে ভেসে গেলো।
আপনার বাসা কি শহরের কোথাও?
মেয়েটি না বোধক মাথা নেড়ে বললোÑ অনেক দূরে, গ্রামে।
বৃষ্টির বেগ আরো বেড়েছে। মুষলধারে পড়ছে। রাস্তার ওপাশে দু’কানগুলোর সামনে অনেক লোক গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অপেক্ষা করছে বৃষ্টি ধরার। রাস্তা প্রায় ফাঁকা। রেইনপ্রুফ কাপড়ে ঢাকা সিএনজি- অটোরিক্সা কখনো এক দুটি গেলে থামানোর জন্য অনেকে হাত তোলে। গাড়ি থামে না। ফাঁকা রাস্তায় দ্রুত ছুটে যায়। বিদ্যুৎ না থাকায় ছাউনির এপাশটা অন্ধকার। এদিকে আশেপাশে কোন মার্কেট বা দোকান নেই। ছাউনির পেছনে দেয়াল ঘেরা ভবনে ব্যাংক ও বিমা অফিস। সেখানে এখন লোকজনের কোলাহল থাকার কথা নয়। বিদ্যুৎ না থাকায় কোন বাতিও জ্বলছে না। খানিক দূরত্বে একটা ফার্মেসি আছে। বৃষ্টিমুখর সময়ে সেদিকে কোন ক্রেতাদের আনাগোনা নেই। রাস্তার ওপাশের দোকানগুলোতে জেনারেটরের আলো তা এখানে এসে আবছা। দোকানের সামনে ভিড় করে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকা লোকগুলো আবছা-অন্ধকারে ছাউনির ব্যাপারটি হয়তো খেয়াল করছে না। খেয়াল করলেও হয়তো গুরুত্ব দিচ্ছে না। অথবা বৃষ্টির কারণে রাস্তা পেরিয়ে এখানে আসতে পারছে না। না হয় বিরাট জটলা বেঁধে যেতো।
সে ইতস্তত দাঁড়িয়ে আছে। কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। আবার তার মনে এও শঙ্কা জাগে, এটা কোন ফাঁদ নয়তো। একবার ভাবে এখানে দাঁড়িয়ে থাকা উচিত নয়। কিন্তু যে বৃষ্টি পড়ছে, পা বাড়ালেই ভিজে জবুথবু হয়ে যাবে। একবার তাকায় মেয়েটির দিকে। একবার বৃষ্টির দিকে। আবার লক্ষ করে পয়েন্টের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের দিকে।
ঝাপটা বাতাস আর বৃষ্টিতে যখন ছাউনিতে আশ্রয় নেয়, আলোহীন পরিবেশে প্রথমে কিছুই বুঝতে পারে নি। সহসা একপাশে অবগুণ্ঠিতা কাউকে দেখে সে চমকে ওঠে। একটি গাড়ির হেডলাইট এসে পড়লো তখন সে অবাক হয়! এতো রাতে এখানে একজন মেয়েকে বসা দেখে। তাও একা! ভাবলো আশেপাশে হয়তো কেউ আছে। কিন্তু আশপাশ ভালো করে নজর বুলিয়ে সেই ভাবে কাউকে দেখা গেলো না। এদিকে কোন পথচারি মানুষও নেই। একটি পানের দোকান ও দু তিনজন ফুটপাতের ব্যবসায়ি বসে। বৃষ্টি থাকায় তারাও নেই। সে মেয়েটির দিকে আড়চোখে তাকালো। সন্দেহ হলো, অন্য কোন পেশাধারীনি কেউ নয়তো! নির্জনে এভাবে তার কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে তার সঙ্কোচ হলো। যখন সে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো তখন তার কানে মেয়েটির কান্নার অস্ফূট শব্দ এলো। সে থমকে দাঁড়ালো এবং মেয়েটির দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলো। লক্ষ্য করলো মেয়েটি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। একজন অষ্টাদশী যুবতি এতো রাতে এখানে কাঁদছে কেন? সে স্থির দাঁড়িয়ে রইলো।
ঘড়ির দিকে তাকালো। রাত দশটা পেরিয়ে এগারোটা ছুঁই ছুঁই। এতোক্ষণে নিশ্চয় তার বাসার গেইট বন্ধ হয়ে গেছে। বৃষ্টি থামার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। অবিরাম ঝরছে। চৈত্রের শুরুতে ভরা বসন্তে এমন টানা বর্ষণের নিয়ম না থাকলেও কয়েকদিন থেকে বৃষ্টির আষাঢ়ের গল্প থামছে না। কখনো থেমে থেমে। কখনো পিনপিনে। কখনো মুষলধারে। এ কয়দিনের টানা বর্ষণ, যানজট, জলাবদ্ধতায় নগরবাসীর নাকাল অবস্থা। আজকের দিনটা একটু ধরেছিলো। সকালের ঝলমলে রোদ আর ফকফকে আকাশ দেখে মনে হয়েছিলো, অসময়ে বৃষ্টির আষাঢ়ের গল্প বুঝি থেমেছে। ফুটপাতের ভাসমান ব্যবসায়িরা তাদের পসরা নিয়ে নেমে পড়ে। এ দু তিনদিন যারা বাইরে বের হয় নি তারাও আজ নগরের রাস্তায় নেমেছে। দুপুর পর্যন্ত দিনের অবস্থা ঠিকঠাক ছিলো। কিন্তু দুপুর গড়াতে না গড়াতে আকাশটা আবারও ঘোলাটে হতে শুরু করলো। তারপর গুমোট মেঘে ছেয়ে গেলো। বিকাল অবধি কালো মেঘের দৌড়াদৌড়ি আর ঘনত্ব বাড়লো। সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে শুরু হলো দমকা হাওয়া। প্রথমে ঝর ঝর বৃষ্টি। সন্ধ্যার পর শুরু হলো অঝোরে বৃষ্টি। বাংলাদেশÑশ্রীলংকার ক্রিকেট ম্যাচ। সে ক্রিকেটের খুব ভক্ত দর্শক। দু দিন হয় তার মেসের টিভিটাও নষ্ট। অফিস থেকে ফেরার পথে মেসে না যেয়ে চলে যায় সাপ্লাই রোডের দিকে। তার বন্ধুর বাসায়।
অফিস বলতে তার স্থায়ী কোন জব নয়। ধরা যায় পার্ট টাইম। একটি প্রকাশনীতে। কম্পোজ, প্রিন্ট আউট, সেটিং, টুকটাক ডিজাইন এই যা কাজ। শেষ করে ফিরতে কোন কোন দিন সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাত আটটাও বেজে যায়। আজ অনেক কাজ থাকা সত্ত্বেও খেলা দেখার লোভে সন্ধ্যার আগে আগে বেরিয়ে পড়ে।
বাসায় পৌঁছে যখন জানলো বৃষ্টির কারণে আজকের ম্যাচটা স্থগিত করা হয়েছে, তখন বাইরে প্রচ- ঝড়। জানালার কাচ আছড়ে পড়ছে বৃষ্টির ছাট। আরো দু তিনজন যারা খেলা দেখতে এসেছিলো তারাও বসে রয় নিরাসক্ত। এক সময় অলস সময় কাটাতে তারা মেতে ওঠে লুডুর বই নিয়ে। আর খেলার ঘোরে কখন রাত নয়টা পেরিয়ে গেলো, খেয়াল ছিলো না। এই দীর্ঘ সময়ে বৃষ্টি থেমেছে আবার নেমেছে। খেলা যখন শেষ বৃষ্টি একটু ধরতেই যে যার পথে বেরিয়ে পড়লো। দেরি করলে বৃষ্টি আবারও বেড়ে যেতে পারে ভেবে সেও নেমে পড়ে রাস্তায়। ছিটা ছিটা বৃষ্টিতে মাথার তালুতে একহাত রেখে হাটতে থাকে। মেইন রোডে গিয়ে রিক্সা মিলতে পারে। সে দ্রুত হাটে। মেইন রোডে গিয়ে পৌঁছলো, কোন রিক্সা দাঁড়িয়ে নেই। যা দু একটি যাচ্ছে যাত্রী নিয়ে। খালি পাওয়া যাচ্ছে না। সে না থেমে দ্রুত হাটতে থাকে। সামনের পয়েন্টে পাওয়া যেতে পারে। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। বাসার গেইট বন্ধ হলে অনেকক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। বৃষ্টি বাড়ার আগে আগেই তার গন্তব্যে যাওয়া চাই। সে পায়ের পর পা ফেলে সামনের দিকে হাটে। চোখ রাখে রিক্সার দিকে। কোনটি খালি পায় না। আকাশে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ফের শুরু হয়েছে ঝাপটা বাতাস আর এলোমেলো বৃষ্টি। সে নিজেকে বাঁচাতে দ্রুত চৌহাট্টা পয়েন্টের দিকে দৌড়াতে থাকে। পয়েন্টের কাছাকাছি আসতে না আসতেই শুরু হলো ঝম ঝম বৃষ্টি। সে দৌড়ে গিয়ে পাশে মোবাইল কোম্পানীর বিজ্ঞাপনযুক্ত ছাউনীতে আশ্রয় নেয়।
মেয়েটিকে নিয়ে তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো। প্রথমেই যদি কিছু জিজ্ঞেস না করে, না জেনে চলে যেতো তাহলে এতাটা পীড়া ছিলো না। কিন্তু এখন জেনে বুঝে তাকে এই অসহায় তিমিরে কিভাবে ফেলে যায়? তার বিবেক বাঁধা দিলো। মেয়েটি অসম্ভব সুন্দরি। চেহারায় আভিজাত্যের ছাপ। যে কারো চোখে পড়ার মতো। তার এই অসহায়ত্বে নিশ্চিত কোন ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। যে ভাবে হোক মেয়েটির এই অসহায়ত্বে পাশে দাঁড়ানো উচিত। সে নিজের মধ্যে নৈতিক ও মানবিক পীড়া অনুভব করলো।
মেয়েটির বাড়ি এ শহর থেকে অনেক দূরে ভিন্ন এক জেলার। তারা দু গাড়িতে হয়ে অনেকজন এসেছিলো প্রাকৃতিক জলপ্রপাতে বেড়াতে। যাওয়ার পথে শহরে যাত্রা বিরতি করেছিলো। তারা নেমে অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরি ও কেনাকাটা করে। এরি ফাঁকে এই মেয়েটি মূল দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থেকে যায়। আর ওরাও খেয়ালের ভুলে চলে যায়। এমনটি হয়তো কারো পক্ষে বিশ্বাস করা কঠিন হতে পারে। এমন ঘটনার যোগসূত্র থাকায় তার কাছে এটি ছিলো বিশ্বাসযোগ্য। দু’বছর আগে ঠিক এরকম পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলো সে নিজেও। তারা বন্ধু-বান্ধব মিলে দু গাড়িতে হয়ে গিয়েছিলো শ্রীমঙ্গলে বেড়াতে। চা-বাগান, লাউয়াছড়া উদ্যানসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক সুন্দর্য উপভোগ শেষে ফেরার পথে শহরে গাড়ি থামায়। গাড়ি দুটি আগ পিছু হয়ে যাওয়ায় এবং পার্কিংয়ের সমস্যায় দুটি ছিলো বেশ ব্যবধানে। রেস্টুরেন্টে বসে খাওয়ার সময় সেখানে তাজা সবুজ লেবু দেখে তার মনে পড়লো, এ শহরে সদ্য গাছ থেকে পাড়া প্রচুর তাজা লেবু পাওয়া যায়। সে কাউকে না জানিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলো। আশপাশে কোন লেবু পেলো না। হাটতে হাটতে চোখে পড়লো অনেকগুলো কাপড়ের দোকান। শুনেছে এখানে কাপড়ও পাওয়া যায় খুব সস্তায়। সে ঢুকে একটি বস্ত্র বিতানে। হরেক ডিজাইনের টি-শার্ট আছে। সে একটার পর একটা দেখতে থাকে। তারপর যখন ফিরলো, সে অবাক! গাড়ি দুটির একটিও নেই। অনেক খোঁজা-খুঁজি করে গাড়ির কোন সন্ধান পেলো না। সহপাঠিরা তাকে রেখে নির্বিঘেœ চলে গিয়েছিলো। যাওয়ার সময় কেউ কেউ গাড়ি পরিবর্তন করেছে। তাই ১ম গাড়িতে যারা ছিলো তারা ভেবেছে হয়তো সে ২য় গাড়িতে উঠেছে। আর ২য় গাড়িতে যারা ছিলো তাদের ধারণা ১ম গাড়িতে উঠেছে। এ নিয়ে তারা খুব একটা না ভেবে হৈ হুল্লোড় করে চলে যায়। এ ঘটনা নিয়ে তার বন্ধুরা আজও হাসাহাসি করে।
বৃষ্টি ধরে আসার সাথে সাথে অপেক্ষমান লোকদের মধ্যে চাঞ্চল্য বেড়ে যায়। তাদের মধ্যে গৃহে ফেরার প্রচ- তাড়া। কে কার আগে গাড়িতে উঠবে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। একটি গাড়ি থামলে এক সাথে অনেকে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। গাড়ি থামানোর হাক-ডাক, হৈচৈ শুরু হয়েছে। কেউ রওয়ানা দিয়েছে পায়ে হেঁটে।
সে কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। অনেকের দৃষ্টি এদিকে পড়লেও গৃহে ফেরার তাড়ায় হয়তো মনোযোগ ভ্রষ্ট হচ্ছে। মেয়েটিকে আবারও সতর্ক করলোÑ প্লিজ, কাঁদবেন না। স্বাভাবিক থাকুন। বুঝাতে চেষ্টা করলো, মানুষজন জট পাকালে আপনার কান্না আপনাকে আরো বিপদের দিকে নিয়ে যেতে পারে। আমিও আপনার পাশে দাঁড়াতে পারবো না। মেয়েটি নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টায় ব্যর্থ হতে হতে অনেক কষ্টে নিজেকে সংবরণ করে।
দ্রুত এ স্থান ত্যাগ করতে হবে। এখানে বেশিক্ষণ থাকা মঙ্গল বোধ করলো না। সে মেয়েটিকে নিয়ে একটি রিক্সায় চেপে বসে।
ছাউনির ভেতরে বৃষ্টির ছাটে মেয়েটির জামা-কাপড় ভিজে প্রায় জবুথবু। ঠা-া শিরশির বাতাসে গায়ের সাথে লেপ্টে থরথর করে কাঁপছে। রিক্সা বাতাসের উল্টো দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কেউ কোন কথা বলছে না। মেয়েটি রিক্সার হুডে একহাতে শক্ত করে ধরে বসে আছে। সে একবার মেয়েটিকে কিছু জিজ্ঞেস করতে গিয়ে রিক্সাওয়ালার দিকে তাকিয়ে নিরব থাকে। মেয়েটার উৎকণ্ঠা ও দুঃশ্চিন্তা সে বুঝতে পারে। তাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে। এটা স্বাভাবিক। এমনটা হতে পারে। চিন্তার কোন কারণ নেই। সব ঠিক হয়ে যাবে। মেয়েটি নিশ্চুপ থাকে। মার্কেট, দুকানপাট প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। যা দু একটি খোলা আছে তাও বন্ধ হবার পথে। সে এক জায়গায় রিক্সা থামায়। মেয়েটিকে বসিয়ে রেখে দ্রুত যায় আবার ফিরে আসে। হাতে একটা বড় টাওয়াল নিয়ে আসে। মেয়েটির হাতে হাসি মুখে ধরিয়ে বলেÑ গায়ে জড়িয়ে নাও, ঠা-া লাগবে না। মেয়েটি কোন কথা না বলে তার দিকে লজ্জা ও কৃতজ্ঞতার মিশেলে তা গ্রহণ করলো।
তারা একটি রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করলো। যেখানে মানুষজন তেমন নেই। নিরিবিলি একটা কেবিনে বসলো, যেখানে একান্তে বসে তার সাথে নিশ্চিন্তে কথা বলা যায়। তার সাথে কথা বলে কোন একটা সিদ্ধান্তও নিতে পারবে।
উদ্বেগ, দুশ্চিন্তায় মেয়েটির চেহারা নিরক্ত পাংশু। ঠিকমতো কথা বলতে পারছে না। গলা জড়িয়ে যায়। কিছু খেতেও চাচ্ছে না। ‘সেই কবে থেকে না খেয়ে আছেন। কিছু খাবেন না, তা হয় না। অবশ্যই আপনাকে কিছু খেতে হবে।’ তার জেদের বশে সে প্লেটে হাত রাখে এবং অতি ধীরে ধীরে একটু একটু করে মুখে তুলে।
সে জিজ্ঞেস করে, আপনার বাসার কোন নাম্বার আছে?
মেয়েটি না সূচক মাথা নেড়ে বলে মুখস্ত নেই।
কোনও নাম্বার মুখস্ত নেই?
মুখস্ত ছিলো, নতুন সিম নেয়ায় সেটি বন্ধ রয়েছে।
আপনার সাথের মোবাইল কোথায়? সে জানতে চাইলো।
উত্তরে যা শুনলো তাতে মেয়েটির ওপর যেমন রাগ হলো তেমনি তার হাসিও পেলো। নিজের মোবাইলটাও সেলফি তুলতে যেয়ে মাধবকু- জলপ্রপাতে দিয়ে এসেছে।
তার মাথায় প্রচ- চাপ অনুভব করলো। চোখ দুটি বন্ধ করে ঠোঁট কামড়ে ধরলো। বিপদ তার খুব আটগাট বেঁধে খুব আয়োজন করে এসেছে। মেয়েটিকে এ নিয়ে আর কিছু জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হলো না। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তার চোখে চেয়ে বললোÑ তোÑ আমি আপনাকে এ রাতের বেলা কী করতে পারি?
মেয়েটি লা-জবাব। মাথা নত করে বসে রয়।
সে যেন চিন্তার গভীর খাদে আটকে গেলো। রাতটা পার হলে না হয় কাল সকালে সে পৌঁছিয়ে দিয়ে আসলো। কিন্তু এ রাতটা কী করবে? সে নিজেও ব্যাচলর। থাকে মেসে। মেয়ে মানুষ না হলে চিন্তার কোন কারণ ছিলো না। তাকে নিয়ে এই রাতে কোথায় যাবে? সে ভাবলো তার বন্ধু-বান্ধবদের সাথে পরামর্শ করা দরকার। তাদের কাছ থেকে কোন সহায়তা পেতে পারে। সে ফোন দিলো। একজন তাকে প্রায় ধমকিয়ে বললোÑ ‘তোকে কি ভূতে কিলিয়ে এ প্যাঁচালে জড়াইছে? নির্ঘাত বিপদে পড়বে। বাঁচতে চাইলে ওকে রেখে তাড়াতাড়ি পালা।’ কেউ কেউ পরামর্শ দিলো, ‘পুলিশের জিম্মায় দিয়ে দিতে। পুুলিশ ঠিকানা মতো পৌঁছে দেবে, কোন ঝামেলা হবে না।’ এই পরামর্শ তার কাছে পছন্দ এবং বেশ যৌক্তিক মনে হলো। সে মেয়েটিকে জানালো। মেয়েটি হয়তো এতোক্ষণে এমনটি আশা করেনি। এবার সে দেখলো তার আশ্বাসের তরী কূলের কাছে এসে ডুবে যাচ্ছে। আঁৎকে উঠলো এবং তার চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেলো। জোড় হাত করে কাঁদতে শুরু করলো। ‘দোহাই লাগে আপনি এমনটি করবেন না, প্লিজ! পুলিশ-কোর্ট হলে, জানাজানি হয়ে যাবে। মান সম্মান থাকবে না। আপনার দোহাই লাগে, আমাকে পুলিশের হাতে দিবেন না। আমার খুব ভয় হয়...।’
মেয়েটির অনুরোধ অশ্রুতে তার মনের নরম মাটিতে গজানো চারাটি ডালপালা ছড়িয়ে আরো পাতাবহুল হরিৎ হয়। সে তাকে বিনীতভাবে আশ্বস্ত করে। শান্ত হোন। একটা উপায় বের করতে হবে।
সে নিশ্চুপ ভাবতে থাকে। তাকে নিয়ে এ রাতটা কিভাবে পার করবে সে ভাবনার পারাবারে কূল পায় না। তার জীবনে যদি এ রাতটা না আসতো তাহলে হয়তো কোনদিন বুঝতে পারতো না, পৃথিবীটা বিশাল হওয়া সত্ত্বেও নারীদের জন্য স্থান কতো সংকীর্ণ। ঘরের বাইরে বিপদগ্রস্ত অবলা কতোটা অসহায় এবং আশ্রয়হীন। অসহায় অবলার পাশে নিঃস্বার্থ কেউ দাঁড়াতে চায় না। বরং কখনো তার চারপাশে সন্দেহ, অপবাদের বৃত্ত তৈরি করে একে একে তীর নিক্ষেপ করে। খাদের কিনারে হোঁচট খেয়ে পড়লে তাকে হাত ধরে না তুলে খাদের গভীরে ফেলার মানুষও সমাজে কম নয়।
সে ঠিক করে রাতটা কোন আবাসিক হোটেলে কাটিয়ে দেবে এবং ভোরে উঠে একটা ব্যবস্থা করবে। প্রথমে ভেবেছিলো তাকে হোটেলে রেখে চলে যাবে এবং ভোরে এসে নিয়ে যাবে। তাতে মেয়েটি প্রচ- অমত করে। সে একা থাকতে রাজি হলো না। অনুনয় করে বললোÑ এতোটুকু যখন করছেন, একা ফেলে যাবেন না। রাতটা থেকে যান। আলাদা একটা রুম নিয়ে নেবেন। সে তাতে কোন অসুবিধে দেখলো না। তাছাড়া এতো রাতে তার মেসে গিয়েও গেট খোলা পাবে না।
কিন্তু হোটেলের গেটে গেটেও এতো বিড়ম্বনা আর বিব্রত অপেক্ষা করছে তার ধারণায় ছিলো না। কোনও হোটেল ম্যানেজার তাদের রুম দিতে রাজি হলো না। বিলাশবহুল কোন হোটেল ভাড়া করার মতো টাকাও তার পকেটে নাই। একজনের কাছে রুম চাইতে সে তাদের পরিচয় জানতে চাইলো। সে এতোটা মিথ্যুক নয় যে হুট করে কোন মিথ দাঁড় করাতে পারে। তার দ্বিধা-সঙ্কোচ দেখে ম্যানেজার বললোÑ ‘যান, অন্য কোথাও যান এখানে রুম খালি নেই। অন্য এক হোটেল ম্যানেজার তার কথা শুনতেই রাজি হলো না। - না ভাই এখানে হবে না। কিছুদিন আগে মামলা খাইছি জরিমানা হইছে। অনেক ঝামেলায় আছি, অন্য কোথাও যান।’
পাশাপাশি হোটেল। সে আরেকটি হোটেলে গেলো এবং বললোÑ ‘আমাদের আলাদা দুটি রুম দিয়ে দিন। লোকটি ভেংচি দিয়ে বললো- নেবার সময়তো আলাদা নিবা, পরেতো এক হইয়া যাইবা।’ চলে আসার সময় বিড়বিড় করে আরো কি সব মন্তব্য করলো। শেষে এক বৃদ্ধ ম্যানেজারের কাছে খোলে বলে টাকা
Blog Archive
-
▼
2018
(26)
-
▼
February
(11)
- প্রথম রাতে কারাগারের সাধারণ খাবার পেলেন খালেদা
- creepy UK castle
- Top 10 Haunted Places in Bangladesh
- ফাঁস হয়েছে এসএসসি পরিক্ষার প্রশ্ন, যা বললেন শিক্ষা...
- বাংলা সংস্কৃতিতে ভূত
- Ghost-story-of-Padma---পদ্দার-ভুতপদ্মার পাড়ে
- 
- How to make Android app & Earn Bamgla
- মেয়েটি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে
- SSC Bangla 2nd Paper Suggestion and Question Patte...
- এখন থেকে আয় হবে দ্বিগুন যাদের ব্লগ অথবা ওয়েবসাইট আ...
-
▼
February
(11)
Thursday, February 1, 2018
মেয়েটি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment